বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ :বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের সহকারী -পরিচালক সেলিনা বেগমকে ঘিরে গত এক দশকে একাধিক অভিযোগ, মামলা ও প্রশাসনিক তদন্তের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতারণা, সাইবার অপরাধ, মানহানি, মারধর ও হয়রানির অভিযোগে দায়ের হওয়া এসব মামলার মধ্যে সর্বশেষ একটি মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, সাবেক স্বামীর করা একটি সাইবার প্রতারণা ও মানহানির মামলায় বরিশালের অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম এস এম শরিয়তুল্লাহ সেলিনা বেগমের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
কারাগারে যাওয়া সেলিনা বেগম (৪০) বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিভাগের উপ-পরিচালক হিসেবে কর্মরত। তিনি বরিশাল নগরীর নতুন আবাসিক এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।
মামলার বাদী মোহাম্মদ হাসানুর রশিদ (বরিশাল জেলার সাবেক ও বর্তমানে লালমনিরহাট জেলা কালচারাল কর্মকর্তা)। মামলার এজাহার ও আদালতের নথি অনুযায়ী, পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে ২০২৫ সালের ১ মার্চ তাদের মধ্যে বিয়ে হয়। পরবর্তীতে দাম্পত্য জীবনে কলহ সৃষ্টি হলে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
আদালতের নিবন্ধন কর্মকর্তা (জিআরও) এসআই হুমায়ন কবির জানান, বাদীর অভিযোগ অনুযায়ী—
বিয়ের পর সেলিনা বেগমের সঙ্গে একাধিক পুরুষের সম্পর্ক রয়েছে বলে বাদী জানতে পারেন
২০২৫ সালের ৩ জুলাই লালমনিরহাটে বাদীর ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা ঘটে
৩১ জুলাই তালাক দেওয়ার পর বাদীর বিরুদ্ধে যৌতুক আইনে মামলা করা হয়
জামিনে মুক্তির পর বাদীর ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও প্রকাশের হুমকি দেওয়া হয়
এসব ছবি বিভিন্ন মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়
এসব অভিযোগের ভিত্তিতে বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা নথিভুক্ত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক লিখিত অভিযোগ ও মামলা রয়েছে—
২০১৮ সাল: বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেন সেলিনা বেগম। অভিযুক্ত পক্ষ অভিযোগ অস্বীকার করে বিষয়টিকে মিথ্যা ও ব্ল্যাকমেইলিং হিসেবে দাবি করেন।
২০১৬ সাল: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জাহানারা ইমাম হলের এক শিক্ষার্থী লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের প্রেক্ষিতে সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং একটি লিখিত মুচলেকার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়।
মির্জাগঞ্জ থানা মামলা: মারধর, শ্লীলতাহানি ও চুরির অভিযোগে মামলা নম্বর–১/১৭ দায়েরের নথি পাওয়া গেছে।
২০২২ সাল: হুমকি ও মানহানির অভিযোগে ভিসি বরাবর লিখিত আবেদন করেন এক ব্যক্তি, যেখানে তিনি নিজেকে শারীরিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বলে উল্লেখ করেন।
অনুসন্ধানে একাধিক সাবেক স্বামী ও ভুক্তভোগীর বক্তব্য পাওয়া যায়। তারা অভিযোগ করেন, ব্যক্তিগত সম্পর্কের জেরে তারা মানসিক, সামাজিক ও পেশাগতভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে এসব বক্তব্যের অনেকগুলো আদালতে বিচারাধীন অথবা আইনগতভাবে নিষ্পত্তিকৃত নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“একাধিক অভিযোগ থাকলে প্রশাসনিকভাবে বিষয়গুলো পর্যালোচনা হওয়া প্রয়োজন। তবে আদালতের রায় ছাড়া কাউকে দোষী বলা যায় না।”
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একাধিক মামলা ও অভিযোগ থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত—এমন নয়। প্রতিটি অভিযোগ আলাদাভাবে তদন্ত ও বিচারযোগ্য। তবে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ, মামলা ও আদালতের আদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা নির্ধারণ করবে আদালত। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও পর্যবেক্ষণ এখন সময়ের দাবি।