বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ : স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে সাম্প্রতিক সময়ে নিয়োগ, পদায়ন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা দেশের সরকারি প্রশাসনে এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদ পাঁচ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে দখল করা হয়েছে—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে পুরো দপ্তরজুড়ে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ঐতিহ্য, জ্যেষ্ঠতার নীতি ও পেশাগত শালীনতা ভেঙে পড়ায় সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা এক ধরনের দমবন্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছরের ১৭ নভেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে ময়মনসিংহ সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অথচ এই নিয়োগে জ্যেষ্ঠতার সুস্পষ্ট নীতিমালা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় আউয়ালের ওপরে থাকা অন্তত তিনজন অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রকৌশলীকে পাশ কাটিয়ে তাকে এই শীর্ষপদে বসানো হয়। নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী বা জ্যেষ্ঠতার ক্রমানুসারে যোগ্য কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়ার রীতি থাকলেও এ ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া মানা হয়নি।
অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, এই নিয়োগের পেছনে ছিল প্রায় পাঁচ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় অনেক পিছিয়ে থাকা সত্ত্বেও বিপুল অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে আব্দুল আউয়াল প্রধান প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেন। এতে শুধু ব্যক্তিগতভাবে কয়েকজন কর্মকর্তা বঞ্চিত হননি, বরং পুরো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কাঠামো ও নৈতিক ভিত্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই নিয়োগের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করেছেন ময়মনসিংহের বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হক। অভিযোগ রয়েছে, তিনি স্থানীয় সরকার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর নিকটাত্মীয় হওয়ায় মন্ত্রণালয়ের ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে তার বিশেষ প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে সচিব, নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হক এবং প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল—তিনজনেরই বাড়ি ময়মনসিংহ হওয়ায় অধিদপ্তরের ভেতরে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক বলয় গড়ে উঠেছে, যাকে কর্মকর্তারা ‘ময়মনসিংহ সিন্ডিকেট’ নামে আখ্যায়িত করছেন। এই সিন্ডিকেটই বর্তমানে অধিদপ্তরের নিয়োগ, বদলি, পদায়ন ও শৃঙ্খলাবিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সচিবের আস্থাভাজন হিসেবে ছামিউল হকই পাঁচ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। এর আগেও নিজের প্রভাব খাটিয়ে তিনি জামাল হোসেন নামের এক কর্মকর্তাকে সরিয়ে শেরপুর থেকে ময়মনসিংহে বদলি হয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এই সিন্ডিকেটের বাইরে থাকা কর্মকর্তাদের মতামত বা আপত্তি কার্যত উপেক্ষিত হচ্ছে, যা দপ্তরের ভেতরে চরম বৈষম্য ও ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
আব্দুল আউয়ালের যোগ্যতা ও দক্ষতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন একাধিক কর্মকর্তা। তাদের অভিযোগ, তিনি কর্মজীবনে কখনো প্রধান কার্যালয়ে দায়িত্ব পালন করেননি এবং কোনো বড় প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবেও কাজ করেননি। দাপ্তরিক অভিজ্ঞতার ঘাটতির কারণে তিনি উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। ইংরেজিতে কথা বলা বা বৈঠক পরিচালনার ন্যূনতম সক্ষমতা তার নেই বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। একজন বিভাগীয় প্রধানের এমন সীমিত দক্ষতার কারণে বিদেশি দাতা সংস্থাগুলোর কাছে অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে এবং চলমান ও ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেওয়ার পর আব্দুল আউয়ালের আচরণ নিয়েও ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি জুনিয়র হওয়া সত্ত্বেও সিনিয়র কর্মকর্তাদের ওপর খবরদারি করছেন এবং দাপ্তরিক শালীনতা ভঙ্গ করে একের পর এক অপেশাদার আচরণ প্রদর্শন করছেন। সামান্য কারণে কর্মকর্তাদের শোকজ করা, সচিবের নাম ভাঙিয়ে চাকরি খাওয়ার হুমকি দেওয়া এবং পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ব্যক্তিগত কটূক্তি করার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে নিয়মিত উঠছে। এমনকি কোনো কর্মকর্তা তাকে দেখে উঠে না দাঁড়ালে নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে শাসানোর মতো আচরণও করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণে অধিদপ্তরের কাজের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হচ্ছে এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এক ধরনের মানসিক চাপ ও ভয়ের মধ্যে কাজ করছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই আব্দুল আউয়াল অধিদপ্তরে নিজের প্রভাববলয় আরও শক্তিশালী করতে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ক্ষেত্রে তার প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন স্টাফ অফিসার কাবিল হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, কাবিল হোসেন একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও সহকারী প্রকৌশলী বা ক্যাডার কর্মকর্তাদের বাদ দিয়ে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে। এতে দপ্তরের প্রচলিত প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে এবং যোগ্য কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
এ ছাড়া কক্সবাজারে দুর্নীতি ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে আগে বরখাস্ত হওয়া কর্মচারী নেতা খোরশেদ আলমকে তিন লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে স্বপদে বহাল করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা এটিকে একটি চরম অনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা দপ্তরের শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে।
অন্যদিকে, ময়মনসিংহের মেকানিক সানাউল্লাহকে নির্বাহী প্রকৌশলী ছামিউল হকের ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে ঝালকাঠিতে বদলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন অধস্তন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা এটিকে চরম অমানবিক ও প্রতিহিংসাপরায়ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমন সিদ্ধান্তের ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ আরও বেড়েছে।
আব্দুল আউয়ালের বিরুদ্ধে এর আগেও সিলেট ও ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালনকালে ফাইল আটকে রেখে ঘুষ গ্রহণ এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তার এসব অনিয়ম এবং পাঁচ কোটি টাকার বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদ বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশন খতিয়ে দেখছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই বিষয়ে স্থানীয় সরকার সচিব রেজাউল মাকছুদ জাহেদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। একইভাবে ঘুষ দিয়ে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসা এবং অনিয়মের অভিযোগ প্রসঙ্গে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোনে এ বিষয়ে কথা বলতে অনিচ্ছুক বলে জানান। তবে সরাসরি কথা বললে বিষয়টি ভালোভাবে বোঝানো যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সার্বিক বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদের জন্য এমন আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ অত্যন্ত ভয়াবহ। যদি এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হয়, তাহলে পুরো প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়তে হলে এই ধরনের সিন্ডিকেটের শেকড় উপড়ে ফেলা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানান, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পাঁচ কোটি টাকা ঘুষের বিনিময়ে প্রধান প্রকৌশলীর পদ দখল করা হয়েছে—এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তদন্ত অগ্রগতির বিষয়ে পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে তারা উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে উদ্ভূত এই পরিস্থিতি কেবল একটি দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়, বরং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নৈতিকতার ওপর একটি গুরুতর প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।