বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ : সরকারি চাকরিতে সীমিত আয়ের বিপরীতে অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) এক সহকারী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত প্রকৌশলীর নাম আল আমিন। অভিযোগ অনুযায়ী, মাসিক প্রায় ২২ হাজার টাকা মূল বেতন পাওয়া এই কর্মকর্তা বরিশাল নগরীর রুপাতলি হাউজিং এলাকায় প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের একটি ৯ তলা ভবনের মালিক।
এই তথ্য সামনে আসার পর বরিশাল নগরজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা। সরকারি একজন কর্মকর্তার আয়ের সঙ্গে এত বিপুল সম্পদের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা মিলছে না—এমন প্রশ্ন তুলছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেতন কাঠামো অনুযায়ী, সহকারী প্রকৌশলীর মূল বেতন প্রায় ২২ হাজার টাকা। বিভিন্ন ভাতা যোগ হলেও মাসিক আয় সীমিতই থাকে। চাকরিজীবনের মেয়াদ আনুমানিক ১৪ বছর ধরে হিসাব করলে বৈধ আয় দিয়ে কয়েক কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা।
একজন সাবেক সরকারি অডিট কর্মকর্তা বলেন,
“যদি উত্তরাধিকার, বৈধ ব্যবসা বা ব্যাংকঋণ না থাকে, তাহলে এমন সম্পদের উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন।”
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বরিশাল নগরীর রুপাতলি হাউজিং এলাকায় অবস্থিত আল আমিনের ৯ তলা ভবনটির জমি ও নির্মাণ ব্যয় মিলিয়ে আনুমানিক মূল্য ১৫–১৬ কোটি টাকা। ভবনটি আবাসিক ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের উপযোগী।
এলাকাবাসীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটি নির্মাণের সময় ব্যয় নিয়ে এলাকাতেই নানা আলোচনা ছিল। স্থানীয় এক নির্মাণসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি জানান, বর্তমান বাজারদরে এমন ভবন নির্মাণ করতে গেলে সরকারি চাকরিজীবীর বৈধ আয়ে তা প্রায় অসম্ভব।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, আল আমিনের নামে সরাসরি সম্পদের পাশাপাশি তার আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের নামে নগরীর বিভিন্ন এলাকায়—
একাধিক প্লট
ফ্ল্যাট
কিছু ব্যবসায়িক বিনিয়োগ
রয়েছে। তবে এসব সম্পদের রেজিস্ট্রি দলিল, ব্যাংক লেনদেন ও প্রকৃত মালিকানা এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের বাইরে রয়েছে।
অভিযোগকারীরা বলছেন, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার ও অনিয়মের মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ এখনো প্রশাসনিক বা বিভাগীয় তদন্তে আসেনি।
এত গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পানি উন্নয়ন বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তর এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা দেয়নি। বরিশাল পাউবো কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এই নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
সচেতন নাগরিক ও সুশাসনকর্মীদের মতে, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ নিষ্পত্তির জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)–এর মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত জরুরি। তারা বলছেন—
সম্পদের আয়-ব্যয়ের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
সম্পদ বিবরণী যাচাই
ব্যাংক হিসাব ও নামে-বেনামে সম্পদের অনুসন্ধান
না হলে সত্য উদঘাটন সম্ভব নয়।
এই প্রতিবেদনের বিষয়ে অভিযুক্ত সহকারী প্রকৌশলী আল আমিনের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পাঠানো ক্ষুদে বার্তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
সরকারি আয়ের সঙ্গে এই সম্পদের উৎস কী?
সম্পদ বিবরণীতে এসব সম্পদ দেখানো হয়েছে কি না?
আত্মীয়দের নামে থাকা সম্পদের প্রকৃত মালিক কে?
সংশ্লিষ্ট দপ্তর কেন এখনো তদন্ত শুরু করেনি?
সরকারি একজন কর্মকর্তার আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের অভিযোগ শুধু একজন ব্যক্তির বিষয় নয়—এটি সরকারি দপ্তরের জবাবদিহিতা ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের বড় পরীক্ষা। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদৌ বিষয়টি তদন্তের আওতায় আনে কিনা।