মামুনুর রশীদ নোমানী, বরিশাল
বরিশালে ঐতিহাসিক সমবায় ব্যাংকের জমি দখল ও অনিয়মের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন সমবায় অধিদপ্তরের বিভাগীয় উপ-নিবন্ধক মোহাম্মদ মোস্তফা। তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার ঘুষের বিনিময়ে ব্যাংকের জমি ব্যক্তি মালিকানায় হস্তান্তরের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে বরিশালে দায়িত্ব পালন করা এই কর্মকর্তা বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নারী কেলেঙ্কারির সঙ্গেও জড়িত। শেরে বাংলা আঞ্চলিক সমবায় ইনস্টিটিউটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাপক অনিয়ম ও অর্থ লুটপাট করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, বরিশাল শহরের প্রাণকেন্দ্র বগুড়া রোডে অবস্থিত ঐতিহাসিক সমবায় ব্যাংকের প্রায় ৩২ শতাংশ জমির একটি অংশ অনিয়মের মাধ্যমে দখল করে সেখানে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বর্তমানে ওই ভবনে ‘নাজেমস বিরিয়ানি’ নামে একটি রেস্টুরেন্ট ব্যবসা পরিচালনা করছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৯০ লাখ টাকার বিনিময়ে জাল কাগজপত্র তৈরি করে জমিটি রেস্টুরেন্ট মালিক ফরিদুর রহমান রেজার কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সমবায় ব্যাংকের সাবেক পরিচালক হোসেন জোমাদ্দার বলেন,
“আমরা লিখিত অভিযোগ করেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাইনি।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, জমি দখলের ঘটনায় সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জড়িত। তাদের মধ্যে রয়েছেন—
বরিশাল বিভাগীয় উপ-নিবন্ধক মোহাম্মদ মোস্তফা
সাবেক উপ-নিবন্ধক (বিচার) মো. রবিউল ইসলাম
সাবেক জেলা সমবায় কর্মকর্তা প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী
সমবায় কর্মকর্তা মাহফুজ
মো. আমিনুল ইসলাম
অভিযোগ রয়েছে, জমি দখলে সহযোগিতার বিনিময়ে এসব কর্মকর্তারা মোটা অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেছেন।
বরিশাল সদর উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা লতিফা আক্তার এ বিষয়ে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমবায় ব্যাংকের জমিতে ভবন নির্মাণ এবং রেস্টুরেন্ট ভাড়া দেওয়ার বিষয়ে সমবায় অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদন নেই।
তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ মিললেও এখন পর্যন্ত সমবায় অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত বরিশাল সমবায় ব্যাংক একসময় উদ্যোক্তা ও কৃষকদের ঋণ প্রদান করত। তবে ২০০১ সাল থেকে ব্যাংকটির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ রয়েছে।
ব্যাংকটির মোট জমির পরিমাণ প্রায় ৩৬ শতাংশ। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে হিসাবরক্ষক পদে একজন কর্মী ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা নেই। ফলে সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো কমিটি বা কার্যকর ব্যবস্থাপনা নেই।
ব্যাংকের হিসাবরক্ষক দেলোয়ার হোসেন বাবুল বলেন,
“আমি খুব বিপদের মধ্যে আছি। বিভিন্নভাবে আমাকে হেনস্তা করা হচ্ছে।”
অভিযোগ রয়েছে, সমবায় ব্যাংকের জমি দখল করে ভারতীয় নাগরিক নিরব হোসেন টুটুল ভবন নির্মাণ করে তা ভাড়া দিয়েছেন রেস্টুরেন্ট মালিকের কাছে। প্রায় অর্ধকোটি টাকা জামানত এবং মাসিক প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকায় ভবনটি ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
এদিকে জমিটি সমবায় অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন হলেও ভাড়ার অর্থ থেকে সরকার কোনো সুবিধা পাচ্ছে না।
সমবায় ব্যাংকের শত বছরের পুরনো ভবনটি বর্তমানে রেস্টুরেন্টের রান্নাঘর হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সমবায় অধিদপ্তরের জেলা ও বিভাগীয় কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জমি দখল হওয়ায় উদ্ধার কার্যক্রম কেবল চিঠি চালাচালির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
এ অবস্থায় দ্রুত তদন্ত করে দখল হওয়া জমি উদ্ধার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন বরিশালের সচেতন নাগরিক ও সমবায় ব্যাংকের সাবেক সদস্যরা।