পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়) উপ-উপাচার্য ও কীটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম হেমায়েত জাহান-এর বিরুদ্ধে গুগল স্কলারে সাইটেশন সংখ্যা কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে গবেষক ও একাডেমিক মহলে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, উপ-উপাচার্য পদে নিয়োগের প্রাক্কালে ড. হেমায়েত জাহান তার Google-এর গবেষণা সেবা প্ল্যাটফর্ম গুগল স্কলারে নিজের প্রোফাইলে অন্য গবেষকদের প্রবন্ধ যুক্ত করেন। এতে তার সাইটেশন সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দুই হাজারে পৌঁছায়।
অনুসন্ধান সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তার প্রোফাইলে সাইটেশন সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৯৬০। তবে বর্তমানে বিদ্যমান প্রোফাইলে মাত্র ৩২৬টি সাইটেশন দেখা যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগের পর পূর্বের প্রোফাইলটি সরিয়ে ফেলা হয়।
গুগল স্কলারের প্রোফাইল গবেষকরা নিজেরাই পরিচালনা করেন এবং প্রবন্ধ যুক্ত বা অপসারণের ক্ষমতাও তাদের হাতে থাকে।
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগে গবেষণায় সক্রিয় ও প্রভাবশালী শিক্ষকদের অগ্রাধিকার দেয়। অভিযোগ উঠেছে, সে সময় উপাচার্য হওয়ার প্রয়াসে ড. হেমায়েত জাহান কৃত্রিমভাবে সাইটেশন সংখ্যা বাড়ান।
পরবর্তীতে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান।
অভিযোগে বলা হয়েছে, নামের মিল থাকা বিভিন্ন দেশের গবেষকের প্রবন্ধ তার প্রোফাইলে যুক্ত করা হয়েছিল। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ান গবেষক Sayka Jahan (S Jahan)-এর বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ তার প্রোফাইলে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশিত হয়নি।
ড. এস এম হেমায়েত জাহান প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় ঘটনাটিকে “অটোমেটিক পদ্ধতির ফল” হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমের কারণে অতিরিক্ত সাইটেশন যুক্ত হয়ে থাকতে পারে এবং বিষয়টি নজরে আসার পর সংশোধন করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় তিনি সাইটেশন বৃদ্ধির বিষয়টি খেয়াল করেননি বলেও দাবি করেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) গবেষক অধ্যাপক ড. মো. গুলজার হোসেন বলেন, গুগল স্কলারে অটোমেটিক আপডেট চালু থাকলে অন্যের আর্টিকেল যুক্ত হয়ে যেতে পারে। তবে একজন গবেষক নিয়মিত প্রোফাইল পর্যবেক্ষণ করলে বিষয়টি সহজেই বোঝা সম্ভব। তার মতে, পদ-পদবি লাভের উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যের সাইটেশন যুক্ত করে রাখা গুরুতর অনৈতিক কাজ। প্রমাণ পেলে গুগল স্কলার সংশ্লিষ্ট আইডি বন্ধ করে দিতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট গবেষক ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) সাবেক মহাপরিচালক ড. এম শহিদুল ইসলাম বলেন, অল্প সময়ে অস্বাভাবিক হারে সাইটেশন বৃদ্ধি পাওয়া প্রশ্নবিদ্ধ। তার ভাষায়, এ ধরনের কর্মকাণ্ড গবেষণা নৈতিকতার পরিপন্থী এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের ক্যারিয়ার মূল্যায়ন করা উচিত।
এটি প্রথমবার নয় যে ড. হেমায়েত জাহানকে ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ২০০৬ সালে কীটতত্ত্ব বিভাগে নিয়োগের সময় তিনি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন না করেও নিয়োগ পান। এছাড়া তৎকালীন উপাচার্য ড. আবদুল লতিফ মাসুম-এর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন নিয়েও আলোচনা ছিল।
পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়েও তাকে ঘিরে মতবিরোধের খবর প্রকাশিত হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ, পদোন্নতি ও গবেষণা অনুদান নির্ধারণে সাইটেশন সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে সাইটেশন কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর অভিযোগ গবেষণা নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে।
এ ঘটনায় এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। তবে একাডেমিক মহল মনে করছে, অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে এবং ভবিষ্যতে গবেষণা মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আরও কঠোরতা আসতে পারে।