বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও বর্তমানে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আজহারুল ইসলামকে ঘিরে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডিরই একজন নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আব্দুস সামাদ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
অভিযোগে বলা হয়, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের আশ্রয়ে থেকে আজহারুল ইসলাম এলজিইডির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন এবং সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরির শুরু থেকেই তিনি রাজনৈতিক পরিচিতিকে পুঁজি করে বিশেষ সুবিধা ভোগ করে আসছেন এবং সরকারি দায়িত্বের আড়ালে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
মো. আজহারুল ইসলাম ১৯৯১ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯২ সালে তিনি এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। ছাত্রজীবনে তিনি চুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সেই সূত্র ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে চাকরিজীবনে প্রভাব বিস্তারে সহায়ক হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
নাটোর জেলায় নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্র অনুমোদনের সময় তিনি ঠিকাদারদের কাছ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে টাকা আদায় করতেন। পাশাপাশি চলতি বিল ও চূড়ান্ত বিল ছাড় করাতে আরও দুই শতাংশ করে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রাস্তার কাজের গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ দিয়ে নিম্নমানের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে সরকারি অর্থ ভাগাভাগি করার কথাও বলা হয়েছে।
নাটোরে এসব অনিয়ম নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা শুরু হলে তিনি কৌশলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের সুপারিশে সেখান থেকে বদলি হয়ে এলজিইডির সদর দপ্তরে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায় বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বাপার্ড) স্থাপন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্পে প্রকৃত প্রয়োজন না থাকলেও একাধিকবার প্রাক্কলন সংশোধন করে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
এছাড়াও পরিচ্ছন্নতা কর্মী নিবাস নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সারাদেশজুড়ে একই ধরনের অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি সুবিধাজনক ও লাভজনক পদে বহাল থেকে ধারাবাহিকভাবে সরকারি অর্থ লোপাট করেছেন।
বর্তমানে সিলেট এলজিইডি অফিসে কর্মরত অবস্থায়ও অনিয়মের অভিযোগ থেমে নেই। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিটি বিলের চূড়ান্ত সুপারিশের সময় অধস্তন কর্মকর্তার মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে দুই শতাংশ হারে অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
এসব অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থ দিয়ে তিনি ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাবর রোডে দুটি বড় ফ্ল্যাট, চট্টগ্রামের হালিশহরে একটি ছয়তলা ভবন, ঢাকার বসুন্ধরা এলাকায় দুটি প্লটসহ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পরও ব্যবস্থা না নেওয়া জনস্বার্থের পরিপন্থী। দুর্নীতি দমন কমিশন আইন অনুযায়ী, দুদক অভিযোগের ভিত্তিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে তদন্ত করতে পারে এবং অবৈধ সম্পদের বৈধ উৎস প্রমাণে ব্যর্থ হলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
অন্যদিকে, এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি দাবি করেন, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না এবং পদায়নের জন্য কোনো তদবিরও করেননি। কর্তৃপক্ষ যেখানে দায়িত্ব দিয়েছে, সেখানেই তিনি সততার সঙ্গে কাজ করেছেন বলে তার বক্তব্য।