
ভুয়া সেমিনারের নামে বিল-ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)–এ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৫ সালের “তারুণ্যের উৎসব” উপলক্ষে দেখানো দুটি সেমিনার বাস্তবে অনুষ্ঠিতই হয়নি। অথচ সেই সেমিনারের নামে কয়েক লাখ টাকার বিল-ভাউচার তৈরি করা হয়েছে।
এই অভিযোগের সূত্র ধরে টানা তিন দিন পিআইবির কার্যালয়ে গিয়ে অনুসন্ধান চালায় কালের কণ্ঠ অনুসন্ধানী টিম। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে একের পর এক অসঙ্গতি, অস্বীকার এবং পরে আংশিক স্বীকারোক্তি।
পিআইবির পরিচালক (প্রশাসন) কাজী মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার–কে প্রথমে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি দাবি করেন, প্রতিষ্ঠানটিতে নিয়মিতই এমন সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
কিন্তু ভুয়া বিল-ভাউচারের বিষয়টি সামনে আনা হলে তিনি ও উপপরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ নাছির উদ্দীন চৌধুরী দুজনেই সেমিনার অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন।
বিল-ভাউচারে তাঁদের স্বাক্ষর দেখানো হলে তাঁরা স্বাক্ষর নিজেদের বলে স্বীকার করলেও কাগজপত্রের বৈধতা অস্বীকার করেন।
তৌহিদুল আনোয়ার বলেন—
“স্বাক্ষর আমারই, কিন্তু এই কাগজে আমি দিয়েছি কি না জানি না। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।”
অন্যদিকে নাছির উদ্দীন চৌধুরী দাবি করেন—
“ওই সময় কোনো সেমিনার হয়নি। এটা একটা রিউমার। প্রযুক্তির যুগে স্বাক্ষর নকল করা অসম্ভব কিছু না।”
অনুসন্ধানী টিম ১৯ ফেব্রুয়ারির ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকার একটি বিল সামনে আনলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
বিলে নিজের স্বাক্ষর দেখে পরিচালক তৌহিদুল আনোয়ার প্রথমে বিস্মিত হয়ে বলেন—
“স্বাক্ষরটা তো আমারই, কিন্তু বিলটা তো ফেক।”
অন্যদিকে দাবি করা হয়, ওই দুই সেমিনারে প্রায় ৪০০ জন অংশগ্রহণকারী ছিলেন, যাদের অধিকাংশই সাংবাদিক। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের কেউই এমন কোনো সেমিনারের কথা জানেন না।
এই অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন পিআইবির সিনিয়র প্রশিক্ষক ও অনুষ্ঠান সমন্বয়কারী গোলাম মুর্শেদ।
প্রথমে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। বিলে থাকা স্বাক্ষরকেও তিনি “ডিজিটালি বসানো” বলে দাবি করেন।
কিন্তু যখন অনুসন্ধানী টিম সরেজমিনে যাচাইয়ের তথ্য ও প্রমাণ উপস্থাপন করে, তখন এক পর্যায়ে তিনি স্বীকার করেন—
“বিলগুলো সাজানো। গত বছর ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারির সেমিনার দুটি আসলে হয়নি।”
তিনি আরও দাবি করেন, এসব ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছিল পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ–এর নির্দেশে।
গোলাম মুর্শেদের ভাষায়—
“ডিজি সাহেব বলছিলেন, একটা প্রোগ্রাম দেখায়ে টাকাটা সমন্বয় করে দিতে।”
গোলাম মুর্শেদের দাবি, মন্ত্রণালয় থেকে আসা বিশেষ বরাদ্দের টাকা সমন্বয়ের জন্যই এসব ভুয়া বিল তৈরি করা হয়েছিল।
তিনি বলেন—
“মন্ত্রণালয়ের কিছু কাজের টাকা খরচ দেখানোর জন্য আমাদের বলা হয়েছিল।”
তিনি আরও দাবি করেন, চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য বরাদ্দকৃত টাকার একটি অংশও অন্য খাতে ব্যয় দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি বলেন—
“এ ধরনের একটি বিল পিআইবির একটি দুষ্টচক্র তৈরি করেছিল, কিন্তু আমি সেটিকে অনুমোদন দিইনি।”
তিনি আরও দাবি করেন, পরে বিষয়টি সামনে এলে তিনি সেই বিল বাতিল করে দেন।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—যদি অনুমোদন না দেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তাঁরসহ ছয়জন কর্মকর্তার স্বাক্ষরসংবলিত বিল তৈরি হলো কীভাবে এবং ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন হলো কেন।
এই ঘটনার পর পিআইবির অভ্যন্তরে দুর্নীতি, ভুয়া বিল এবং প্রশাসনিক অনিয়ম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে—
ভুয়া সেমিনারের নামে বিল তৈরি হলো কীভাবে
ছয়জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর এল কোথা থেকে
ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন হলো কার নির্দেশে
মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের অর্থ অন্য খাতে ব্যবহারের অভিযোগ কতটা সত্য
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী
বরিশাল খবর অফিস: সিএন্ডবি রোড, বরিশাল
ইমেইল: nomanibsl@gmail.com
মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি
© বরিশাল খবর সর্বস্ব সংরক্ষিত