
ঢাকা: সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এ অনুষ্ঠিত কথিত ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
তদন্তে উঠে এসেছে—মাত্র দুই দিনে চারটি অনুষ্ঠানের নামে প্রায় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট নথি, অংশগ্রহণকারীর তালিকা, ভাউচার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যাচাই করে দেখা গেছে—এই ব্যয়ের বড় অংশই ভুয়া বিল, জাল স্বাক্ষর এবং অস্তিত্বহীন আয়োজনের ওপর দাঁড়িয়ে।
পিআইবির মূল কাজ কী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আইন–২০১৮ অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব হলো—
সাংবাদিকতা বিষয়ে গবেষণা
প্রকাশনা
সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ ও উপদেষ্টা সেবা প্রদান
কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানেরই একটি আয়োজন ঘিরে উঠে এসেছে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ।
চারটি অনুষ্ঠানের নামে প্রায় ২৪ লাখ টাকা
২০২৫ সালের ১৮ ও ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে চারটি অনুষ্ঠানের ব্যয় দেখানো হয়।
তারিখ: ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
স্থান: পিআইবি অডিটোরিয়াম
ব্যয়: ৫,৭৩,০০০ টাকা
তারিখ: ১৮-১৯ ফেব্রুয়ারি
ব্যয়: ৪,৬৭,৫০০ টাকা
তারিখ: ১৮ ফেব্রুয়ারি
ব্যয়: ৬,৯১,৫০০ টাকা
তারিখ: ১৯ ফেব্রুয়ারি
ব্যয়: ৬,৬৫,৫০০ টাকা
মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৪ লাখ টাকা।
ভাতার নামে ৪ লাখ টাকা
দুটি সেমিনারের নামে দেখানো হয়—
২০০ জন অংশগ্রহণকারী
প্রত্যেককে ১,০০০ টাকা করে ভাতা
দুটি সেমিনারে মোট ভাতা দেখানো হয় ৪ লাখ টাকা।
এছাড়া—
৫০ জনের যাতায়াত ভাতা
২৫০ প্যাকেট নাশতা
২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ
আলোচকদের সম্মানী
সহ বিভিন্ন খাত দেখানো হয়েছে।
বিদেশে থাকা সাংবাদিকের নামে ভাতা
তদন্তে বড় অসঙ্গতি ধরা পড়ে এক সাংবাদিকের নাম নিয়ে।
তালিকায় দেখা যায়—
এস এম আজাদ নামে এক সাংবাদিক সেমিনারে উপস্থিত হয়ে ভাতা নিয়েছেন।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—
তিনি ২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে পর্তুগালে চলে যান
সেমিনারে উপস্থিত থাকার প্রশ্নই ওঠে না
তালিকায় থাকা স্বাক্ষরও ভুয়া
এই ঘটনার পর তালিকায় থাকা আরও ৭০ জন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সবাই সেমিনারে অংশ নেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।
‘আমার স্বাক্ষর নয়’
তালিকায় থাকা বিভিন্ন সাংবাদিক বলেন—
তাঁরা সেমিনারের বিষয়ে কিছুই জানেন না
তালিকায় থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়
এতে স্পষ্ট হয় স্বাক্ষর জাল করে অংশগ্রহণ দেখানো হয়েছে।
আলোচকদের নামও ভুয়া
সেমিনারের আলোচক হিসেবেও যাদের নাম দেওয়া হয়েছে—
কেউ ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি
কেউ আমন্ত্রণই পাননি
কারও স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে
ভুয়া ভাউচারের প্রমাণ
তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে—
একই মেমো নম্বর ব্যবহার করে দুটি বিল তৈরি।
দোকান কর্তৃপক্ষ জানায়—
“এই বিল আমাদের নয়, হাতের লেখাও আমাদের না।”
ডেকোরেটর প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করা হলেও—
দোকানে কোনো ডিজাইন বা প্রিন্টিং ব্যবস্থা নেই
কর্মীরা স্বাক্ষর অস্বীকার করেন
এক রেস্তোরাঁর নামে দেখানো হয়—
২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ
প্রতিটির দাম ৫০০ টাকা
দোকান কর্তৃপক্ষ জানায়—
“আমাদের এখানে প্যাকেট লাঞ্চ এত দামি হয় না।”
এছাড়া ভাউচারের রঙ ও ফরম্যাটও দোকানের সঙ্গে মেলেনি।
ফেসবুকে নেই সেমিনারের কোনো ছবি
পিআইবির ফেসবুক পেজে নিয়মিত অনুষ্ঠান প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু—
১৮–১৯ ফেব্রুয়ারির সেমিনারের কোনো ছবি নেই
প্রেস রিলিজ নেই
ওয়েবসাইটেও উল্লেখ নেই
জায়গাই নেই ২০০ জনের সেমিনারের
পিআইবির অবকাঠামো অনুযায়ী—
অডিটোরিয়াম: ২৩৮ আসন
সেমিনার কক্ষ: ৬০ আসন
শ্রেণিকক্ষ: ৩০ আসন
অর্থাৎ ২০০ জনের সেমিনার করার মতো জায়গাই নেই।
তদন্তকারী দলের সামনে পিআইবির কর্মকর্তা গোলাম মুর্শেদ এক পর্যায়ে স্বীকার করেন—
এই বিলগুলো মহাপরিচালকের নির্দেশেই তৈরি করা হয়েছে।
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—
একটি দুষ্টচক্র ভুয়া বিল তৈরি করেছে
তিনি তা অনুমোদন দেননি
তবে নথিতে তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে।
তদন্তে জানা যায়—
২০২৫ সালের ২৯ ও ৩০ জুন চারটি চেকের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংক থেকে উত্তোলন করা হয়—
৬,৯১,৫০০ টাকা
৪,৬৭,৫০০ টাকা
৬,৬৫,৫০০ টাকা
৫,৭৩,০০০ টাকা
মোট ২৩,৯৭,৫০০ টাকা।
পুরো ঘটনায় সামনে এসেছে—
ভুয়া সেমিনার
জাল স্বাক্ষর
ভুয়া ভাউচার
অস্তিত্বহীন অংশগ্রহণকারী
ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন
ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পিআইবির আর্থিক স্বচ্ছতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী
বরিশাল খবর অফিস: সিএন্ডবি রোড, বরিশাল
ইমেইল: nomanibsl@gmail.com
মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি
© বরিশাল খবর সর্বস্ব সংরক্ষিত