
বরিশাল খবর অনলাইন নিউজ : স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাজশাহী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো: শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী কাজী আব্দুস সামাদের স্বাক্ষর করা একটি লিখিত অভিযোগ দুর্নীতিদমন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। অভিযোগের সূত্র ধরে মাঠপর্যায়ে খোঁজ নিয়ে তার দীর্ঘ কর্মজীবনে অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নানা চিত্র উঠে এসেছে।
মো: শাহাদাত হোসেন ১৯৯২ সালে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে পড়াশোনা শেষ করেন। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। ১৯৯৪ সালে এলজিইডিতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পান। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করেই তিনি দ্রুত পদোন্নতি ও কাঙ্ক্ষিত পোস্টিং বাগিয়ে নেন।
বিশেষ করে বাগেরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য শেখ হেলালের ছেলে শেখ তন্ময়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে শেখ হেলালের তদবিরে মো: শাহাদাত হোসেন বাগেরহাট জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। সেখানে তিনি টানা প্রায় আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ সময়ে স্থানীয় আওয়ামীপন্থী ঠিকাদারদের সঙ্গে তার গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বাগেরহাটে দায়িত্ব পালনকালে প্রায় সব উন্নয়ন কাজের টেন্ডারই অনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারের হাতে তুলে দেওয়া হতো বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানিয়েছেন, কোন কাজ কে পাবে—তা আগেই ঠিক হয়ে যেত। প্রকাশ্যে দরপত্র হলেও বাস্তবে সিদ্ধান্ত হতো গোপন আলোচনায়। শাহাদাত হোসেনের সময়ে টেন্ডার বাণিজ্য ছিল “ওপেন সিক্রেট”।
ঠিকাদারদের দাবি, প্রতিটি টেন্ডার অনুমোদনের সময় তিনি ৫ শতাংশ এবং কাজের বিল ছাড় করার সময় আরও ২ শতাংশ অর্থ আদায় করতেন। এই কারণেই অনেক ঠিকাদার তাকে নাম ধরে না ডেকে ‘৫ শতাংশ’ নামেই চিনতেন। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই বিল তুলে সেই টাকা ঠিকাদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
দুর্নীতির বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আসতে শুরু করলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি তৎকালীন মন্ত্রী তাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাগেরহাট থেকে সুনামগঞ্জে বদলি নেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে আরও বড় অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আলী আকতারের সহায়তায় রাজশাহী অঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পদে পদায়ন হন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চলেও একই কৌশলে তিনি অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিল প্রত্যয়ন দিতে ২ শতাংশ এবং তদন্ত কার্যক্রমে ৩ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ আদায় করার প্রমাণ মিলেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো—সরকার পরিবর্তনের পর তিনি হঠাৎ রাজনৈতিক অবস্থান বদলে ফেলেছেন। আগে সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও মন্ত্রী তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও এখন নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করে পুরোনো অপরাধগুলো আড়াল করার চেষ্টা করছেন বলে এলজিইডির একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন।
এছাড়া এলজিইডির এমএমটি (মেকানিক্যাল মেইনটেন্যান্স ট্রেনিং) ও যান্ত্রিক শাখার বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তদন্তে আরও জানা গেছে, বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন সম্পদের মালিক তিনি। অভিযোগ অনুযায়ী, তার নামে ও বেনামে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট, পূর্বাচলে দুটি প্লট, কল্যাণপুরে সাততলা ভবন, চট্টগ্রামে ছয়তলা একটি ভবন, চাঁদপুরে একটি বাড়ি এবং বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অঙ্কের অর্থ জমা রয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকার কাছাকাছি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে মো: শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আইনি দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাইকোর্ট একাধিক রায়ে স্পষ্টভাবে বলেছেন, কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে কর্তৃপক্ষ চাইলে তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রেখে তদন্ত করতে পারে এবং সেটাই সঠিক পদ্ধতি। একাধিক মামলার রায়ে বলা হয়েছে, দায়িত্বে রেখে তদন্ত করলে তা সুষ্ঠু তদন্তের পরিপন্থী এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
দুর্নীতিদমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী, দুদক অভিযোগ পেলেই অথবা স্বপ্রণোদিত হয়েও তদন্ত শুরু করতে পারে। এলজিইডির ভেতরের মহলে এখন একটাই প্রশ্ন—এতসব গুরুতর অভিযোগের পর মো: শাহাদাত হোসেনের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী
বরিশাল খবর অফিস: সিএন্ডবি রোড, বরিশাল
ইমেইল: nomanibsl@gmail.com
মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি
© বরিশাল খবর সর্বস্ব সংরক্ষিত