জেলার খবর

রাজাপুরের বিষখালী নদীতে রাতের অন্ধকারে চলছে ইলিশ শিকার

  প্রতিনিধি ১০ অক্টোবর ২০২২ , ৫:৩৯:২১ প্রিন্ট সংস্করণ

বিশেষ সংবাদদাতা: ইলিশ ধরার ওপরে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ঝালকাঠী জেলার রাজাপুরের বিষখালী নদীতে রাতের অন্ধকারে ইলিশ ধরছে একশ্রেণির দুর্বৃত্ত নামের অসাধু জেলেরা। এদের মদদ দিচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

স্থানীয় প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নদীতে চলছে ইলিশ ধরার মহোৎসব। নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাতের বেলায় নদীতে অভিযান পরিচালনা অনেকটাই ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

রাজাপুরের দক্ষিন পালট থেকে শুরু করে নাপিতের হাট পর্যন্ত বিষখালী নদী অংশে অসাধু জেলেরা রাতের আধাঁরে ইলিশ শিকারে ব্যস্ত। চল্লিশ কাহনিয়া লঞ্চঘাট থেকে প্রশাসনের ট্রলার নাপিতের হাটের দিক রওয়ানা হলেই এসব জেলে নামের দুর্বৃত্তরা ইলিশ শিকারে ব্যস্ত হয়ে পরে। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে কালু মোল্লা,মুসা,আলম,দুলাল,ফজলে হক,ফেরদাউস,দেলোয়ার,খলিলসহ অর্ধশত জেলেরা ছোট ছোট শিশুদের নিয়ে রাতের বেলায় জোয়ার হলে এবং প্রশাসনের ট্রলার নাপিতের হাটের দিকে চলে যাবার পরই তারা নদীতে জাল নিয়ে নেমে পড়ে। এসব জেলেরা সরকার থেকে প্রাপ্ত ভিজিএফের চালও গ্রহন করেছেন। এদের নৌকা ও ট্রলারে থাকে লাঠিসোটাসহ ধারালো অস্ত্র। এরা বিগত দিনে অভিযানের সময় প্রশাসনের লোকদের ওপর হামলা করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রাতে নদীতে অসংখ্য মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার মাছ শিকার করছে বলে জানান
নদীতে রাতের বেলায় চলাচলকারী একাধিক নৌযানের চালকরা।
রাজাপুর উপজেলা ও জেলা মৎস্য কর্মকর্তারা বলেছেন কঠোর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই নিধোজ্ঞা চলবে আগামী ২৮ অক্টোবর মধ্যরাত পর্যন্ত।

মা ইলিশকে স্বাচ্ছন্দে ডিম ছাড়ার সুযোগ দিতেই এ সময়ে ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’ এর অধীন প্রণীত ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস, ১৯৮৫’ অনুযায়ী, সারা দেশে ইলিশ মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ, ক্রয়-বিক্রয় ও বিনিময় নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এসময় দেশব্যাপী ইলিশ আহরণ, বিপণন, ক্রয়-বিক্রয়, পরিবহন, মজুত ও বিনিময় নিষিদ্ধ থাকবে। ইলিশ আহরণে বিরত থাকা সরকারিভাবে নিবন্ধিত জেলেদের সরকার খাদ্য সহায়তা হিসেবে দেবে ভিজিএফ চাল।

কিন্তু সরকারের এতসব উদ্যোগের পরেও রাতের অন্ধকারে বিষখালী নদীর বিভিন্ন স্থানে নদীতে চলছে ইলিশ শিকার। দিনের বেলা নদীতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হলেও রাতে নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং প্রশাসন কোনও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নদীতে যায় না।

এই সুযোগেই জেলেরা নৌকা নিয়ে ইলিশ শিকার করছে। ধরছে মা ইলিশ। ঢাকা ও বরগুনাগামী লঞ্চে আসা-যাওয়ার পথে এ দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানান দোতালা লঞ্চগামী লঞ্চের যাত্রী কামাল হোসেন।

নৌযান পরিচালনাকারী সদস্যরা জানিয়েছেন, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা- উপজেলা থেকে ঢাকার দিকে ছেড়ে আসা এবং ঢাকা থেকে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের উদ্দেশে ছেড়ে যাওয়া লঞ্চগুলো নদীতে স্বাচ্ছন্দে চলতে পারে না। রাতে নদীতে জাল ফেলে জেলেরা নৌকায় বা ট্রলারে অবস্থান করেন।

কোনও নৌযানকে তাদের জালের কাছাকাছি দিয়ে আসতে দেখা মাত্রই নৌকা থেকে উচ্চ আলো ছড়াতে সক্ষম টর্চ লাইট দিয়ে দিক পরিবর্তনের নির্দেশনা দেয়।

লঞ্চগুলোর চালকরা এসব টর্চের আলোতে দেখানো নির্দেশনা অনুযায়ী দিক পরিবর্তনের মাধ্যমে জাল ফেলা এলাকা অতিক্রম করে।

মৎস্য বিভাগ জানিয়েছে আমাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতে কোনও দুর্বৃত্ত নদীতে ইলিশ মাছ ধরছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে। যদি এমন কোনও ঘটনা ঘটে— তাহলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মৎস্য ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে দিনে-রাতেই নদীতে টহল দেওয়া হয়। মা ইলিশ রক্ষায় নদীতে অভিযান পরিচালনায় মোবাইল কোর্টের কার্যক্রম চলছে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিষখালী নদীর তীর লাগোয়া তিন থেকে চারটি স্থানে রাত গভীর হলেই জমে ওঠে অবৈধভাবে ধরা এসব ইলিশের হাট। এসব হাটেই রাতের বেলায় ধরা ইলিশ বিক্রি হয়ে যায়।

এসব হাট থেকে ইলিশ কিনে নিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করছেন তারা। আবার কেউ কেউ সংরক্ষণ করছেন। মাত্র তো কয়েকটা দিন। এর পরেই তো এসব মাছ প্রকাশ্যে বিক্রি হবে, যখন নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। দিনে প্রশাসনের নজরদারি এড়াতে রাতই অনেকটা নিরাপদ মনে করছেন তারা। প্রতি বছরের মতো এবারও স্থানীয় প্রশাসন মা ইলিশ শিকারের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছে।

কিন্তু ঠেকানো যাচ্ছে না ইলিশ নিধন কার্যক্রম। কেজির পরিবর্তে হালি ধরে বিক্রি হচ্ছে এসব ইলিশ।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রালয় জানিয়েছে, আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমার আগে-পরে মিলিয়ে মোট আগে ১৫ থেকে ১৭ দিন ইলিশের ডিম ছাড়ার প্রধান মৌসুম মনে করা হলেও এখন সময় আরও বাড়িয়েছে সরকার।

গবেষকদের মতে, ইলিশ শুধু আশ্বিনের ভরা পূর্ণিমায় নয়, অমাবশ্যায়ও ডিম ছাড়ে। সে কারণে সময় বাড়িয়ে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়িয়ে ২২ দিন করা হয়েছে। এ সময় সাগর থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মা ইলিশ ছুটে আসে নদীতে। ফলে মা-ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রতিবছর তিন সপ্তাহ ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ করে সরকার।

সে কারণেই সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ বছর ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। উল্লেখ্য, ইলিশ সম্পদ সংরক্ষণে ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর অধীন প্রণীত ‘প্রটেকশন অ্যান্ড কনজারভেশন অব ফিশ রুলস, ১৯৮৫’ অনুযায়ী, মোট ২২ দিন সারা দেশে ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিপণন নিষিদ্ধ।

এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করা হলে আইনে কমপক্ষে এক থেকে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

আরও খবর

Sponsered content

Verified by MonsterInsights