অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

২৫১১ কোটির বিজ্ঞান শিক্ষার প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম

  প্রতিনিধি ৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ , ১১:৪১:৫৬ প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ২ হাজার ৫১১ কোটি টাকার ‘সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্পে’ চলছে ব্যাপক অনিয়ম। প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হলেও কাজ বাকি রয়েছে এখনও প্রায় ৭৮ শতাংশ। এখন পর্যন্ত নির্মাণাধীন ২০০টি ভবনের একটিও হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। তবে নতুন ভবনের জন্য আসবাবসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনাকাটা থেমে নেই। এসব কিনতে গিয়ে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা।

সম্প্রতি সরকারি ক্রয় নীতিমালা (পিপিআর) লঙ্ঘন করে প্রথম ৬ জনকে বাদ দিয়ে আসবাব সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়েছে সপ্তম এবং চতুর্থ দরদাতাকে। আসবাব প্রস্তুতকারী দেশের বড় নামিদামি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরও তাদের কাজ দেওয়া হয়নি। এই দুই দরপত্রে সরকারের গচ্চা গেছে প্রায় এক কোটি টাকা। তবে প্রথম সর্বনিম্ন দরদাতা থেকে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের দরের পার্থক্য প্রায় দুই কোটি টাকা।

বিজ্ঞান শিক্ষার এই প্রকল্পের অধীনে এ বছরের ২৪ মার্চ কলেজের আসবাব সরবরাহের দরপত্র আহ্বান করা হয়। ২৭ এপ্রিল দরপত্র উন্মুক্ত করা হয়। এতে প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ টাকা দিয়ে প্রথম দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় প্রমিক্সো লিমিটেড। ২ কোটি ৯১ লাখ টাকায় দ্বিতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় পারটেক্স ফার্নিচার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা দিয়ে তৃতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় আখতার ফার্নিশার্স লিমিটেড। আর ৩ কোটি ৪৮ লাখে চতুর্থ দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড। গত ২৯ জুন চতুর্থ দরদাতা প্রতিষ্ঠানকেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

এর আগে গত বছরের শেষ দিকে আসবাব সরবরাহের আরেকটি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। গত বছরের ১৮ নভেম্বর দরপত্র উন্মুক্ত করা হলে প্রথম দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় ডিজাইনটেক ইন্টেরিয়র অ্যান্ড ফার্নিশার্স ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। তারা দর দেয় ১ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। প্রমিক্সো লিমিটেড এক কোটি ৬২ লাখ টাকা দর দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয়। ১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা দর দিয়ে তৃতীয় দরদাতা প্রতিষ্ঠান হয় আরএফএল প্লাস্টিকস লিমিটেড। অটবি লিমিটেড ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা দর দিয়ে চতুর্থ দরদাতা হয়। কম্পিউটার ওয়ার্ল্ড বিডি ১ কোটি ৯২ লাখ টাকা দর দিয়ে পঞ্চম হয়। ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা দর দিয়ে ষষ্ঠ হয় অরনেট প্লাস। দুই কোটি ১৪ লাখ টাকা দর দিয়ে সপ্তম হয় হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড। কিন্তু সপ্তম দরদাতাকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

পরপর দুটি দরপত্রে সপ্তম ও চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়ায় এই প্রকল্প-সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। আবার দুটি দরপত্রে একই প্রতিষ্ঠান যে স্থানেই থাকুক না কেন তাদেরই কাজ দেওয়ায় সেই অভিযোগ আরও জোরালোভাবে দানা বেঁধেছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. খন্দকার মুজাহিদুল হক বলেন, ‘এবারের দরপত্রে চাহিদামতো সব কাগজপত্র আপলোড না করায় প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরদাতাকে কাজ দেওয়া সম্ভব হয়নি। চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়া হয়েছে। এখানে কোনো অনিয়ম হয়নি। পিপিআর অনুসরণ করেই কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে।’
‘দ্বিতীয় ও তৃতীয় দরদাতার কোন কাগজে ঘাটতি ছিল’ তা জানতে চাইলে উপ-প্রকল্প পরিচালক জেসমিন তাসমিলা বানু ও রিসার্চ অফিসার ইব্রাহীম মিয়া জানান, ‘দ্বিতীয় দরদাতা পারটেক্স ফার্নিচার ফরেস্ট স্টিউয়ার্ডশিপ কাউন্সিল-এফএসসি সার্টিফিকেট দেয়নি। তাদের অডিট রিপোর্টও আপডেট নেই। আর আখতার ফার্নিশার্স এফিডেভিট অব ওনার্সশিপ, কোম্পানি প্রোফাইল ও প্রোডাক্টের বারকোড দেয়নি। এজন্য এই দুই প্রতিষ্ঠান কাজ পায়নি।’

পারটেক্স ফার্নিচার ও আখতার ফার্নিশার্সের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, এই প্রকল্পের দরপত্রে মোট ১৯ ধরনের কাগজপত্র চাওয়া হয়েছিল, যার সবকিছুই দেওয়া হয়েছে। আমাদের মতো কোম্পানির ওনার্সশিপ, কোম্পানি প্রোফাইল বা প্রোডাক্টের বারকোড নেই- এটা বলাটা হাস্যকর। কোম্পানি প্রোফাইল তো সবার ওয়েবসাইটেই আছে। এ ছাড়া আমাদের কোম্পানির অডিট নিয়মিত আপডেট হয়। এফএসসি সার্টিফিকেটও আছে। আমরা অতীতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ একাধিক খাতে কাজ করেছি।

নাম প্রকাশ না করে শিক্ষার সাবেক এক প্রকল্প পরিচালক বলেন, সবার আগে দেখা উচিত কম দামে ভালো প্রোডাক্ট কেনা কিনা। পারটেক্স ও আখতার দুটিই ভালো কোম্পানি। তারা সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পর যদি দেখা যায়, কোনো কাগজে ঘাটতি আছে তাহলে প্রি-মিটিং করে তাদের কাছে সে কাগজ চাওয়ার সুযোগ ছিল। সেটা পিপিআরেও বলা আছে। কিন্তু সেটা না করে বারবার একই কোম্পানিকে কাজ দেওয়ার মানে সেখানে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়েছে।

প্রকল্প-সংশ্নিষ্টরা জানান, সাধারণত যে কোনো কেনাকাটায়ই কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো কমপক্ষে ৬ শতাংশ কমিশন দিয়ে থাকে, যা মূলত প্রকল্প পরিচালক ও অন্যান্য কর্মকর্তার পকেটে যায়। কিন্তু এই ৬ শতাংশ অর্থও নেওয়া হয় প্রথম বা দ্বিতীয় দরদাতাদের কাছ থেকে। কিন্তু দুটি বড় কোম্পানি থাকার পরও চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়ার পেছনে বড় ধরনের কোনো অনিয়ম থাকাটাই স্বাভাবিক।

অভিযোগ উঠেছে, এবার প্রথম দরদাতা প্রতিষ্ঠান কাজ না পেলেও দ্বিতীয় দরদাতা স্বাভাবিকভাবেই কাজ পাওয়ার যোগ্য। আর দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ দরদাতার অর্থের পার্থক্য প্রায় ৫৬ লাখ টাকা। এই টাকা থেকেই প্রকল্প-সংশ্নিষ্টদের মধ্যে একটা দফারফা তথা ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে থাকতে পারে।
অবশ্য প্রকল্প পরিচালক ড. খন্দকার মুজাহিদুল হক বলেন, ‘কাজ দেওয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেনের সম্পর্ক নেই। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলছি, কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন হয়নি। এবার চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়ার আগে আমি আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছি। আমার কিছু পরিচিতজন, যারা বড় বড় ঠিকাদার তাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। চতুর্থ দরদাতাকে কাজ দেওয়ায় নিয়মের কোনো লঙ্ঘন হয়নি। কোনো ছোট কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হয়নি। এত ভালো ফার্নিচার এর আগে কেউ কখনও দিতে পারেনি।’

তিনি আরও বলেন, এত সামান্য বিষয়ে সাংবাদিকরা তাঁকে বিরক্ত করছেন দেখে তিনি দুঃখ পাচ্ছেন। তিনি নিজেও সাংবাদিক ছিলেন। এত ছোট বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো সাংবাদিকদের কাজ নয়।

জানা যায়, ২ হাজার ৫১১ কোটি টাকার ‘সরকারি কলেজসমূহে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ প্রকল্প’ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জুলাই। এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত। কিন্তু এখন পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে মাত্র ২২ দশমিক ১১ শতাংশ। এই প্রকল্পের অধীনে ২০০ সরকারি কলেজে অবকাঠামো উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক আইসিটি ও বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম সরবরাহ, শিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিসহ নানা কাজ করার কথা। এখন পর্যন্ত একটি ভবনও হস্তান্তর করা সম্ভব না হলেও ২০০ কলেজের জন্য কেনা হয়েছে ২০০ ডিজিটাল ক্যামেরা, সিসি ক্যামেরার আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র। অর্থাৎ মূল কাজ না এগোলেও অব্যাহত আছে কেনাকাটা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ডিজিটাল ক্যামেরা কিনতে নিষেধ করা হলেও তা এই প্রকল্প থেকে মানা হয়নি। তবে এখন অব্যবহূত থেকে ক্যামেরাগুলোর ওয়ারেন্টি শেষ হয়ে যাচ্ছে। এমনকি প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই হয়তো ক্যামেরাগুলো তাদের কার্যক্ষমতাও হারাতে পারে। এ ছাড়া প্রকল্প অফিসের জন্য কয়েক কোটি টাকায় কেনা হয়েছে দামি দামি আসবাব, বিভিন্ন ধরনের অফিস সরঞ্জামসহ অত্যাধুনিক গাড়ি। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

এর আগে নানা অনিয়মের অভিযোগে এই প্রকল্পের প্রথম পরিচালককে গত বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাহার করে নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এরপর খন্দকার মুজাহিদুল হক যোগদান করেন গত বছরের ৫ মে। এরপর থেকেই মূলত জোরেশোরে শুরু হয়েছে শিক্ষার এই বৃহৎ প্রকল্পের ‘কেনাকাটা’। তবে আগের পরিচালককে যেসব কারণে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, এখন একই ঘটনা ঘটাচ্ছেন বর্তমান পরিচালকও। আগের পরিচালকের দেখানো পথেই বর্তমান পরিচালকও হাঁটছেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষা ক্যাডারের একাধিক কর্মকর্তা।

Print Friendly, PDF & Email

আরও খবর

Sponsered content

Verified by MonsterInsights