অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

মাসে আয় ১৩ লাখ, এককালীন ১ কোটি সিট বাণিজ্যে কোটিপতি!

  প্রতিনিধি ২৯ আগস্ট ২০২২ , ৪:৩৪:১৭ প্রিন্ট সংস্করণ

ইদ্রিস আলম ও জাফর ইকবাল :
নানান বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের জন্য বর্তমানে ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’ রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ। আর এর নেপথ্যে রয়েছে কলেজটির শাখা ছাত্রলীগ। এখানে পদ-পদবি পাওয়া মানে সরকারি চাকরি পাওয়ার অবস্থা। সিট বাণিজ্যের সঙ্গে শুধু সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভা একাই জড়িত নন। কলেজ শাখা ছাত্রলীগের ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির ৬/৭ জন ছাড়া সবাই জড়িত। এই ৬/৭ জন হলে সিট না পাওয়ায় সিট বাণিজ্যের বাইরে রয়েছেন বলে ছাত্রলীগের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানিয়েছে।

সিট বাণিজ্যের সহজ সমীকরণ:
কয়েকজন সহ সভাপতি ও সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, ৬টি হলে ছাত্রলীগের জন্য বরাদ্দ রয়েছে ১০০টি রুম। কিন্তু এর বাইরেও রুম থাকার সত্যতা মিলেছে। প্রত্যেক রুমে ১০-১৫ জন করে থাকে। ১০×১০০= ১০০০ শিক্ষার্থীকে শাখা ছাত্রলীগের মনোনীত রুমে ওঠানো হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এককালীন টাকা দিয়ে উঠেছে আবার কেউ মাসিক ভাড়া পদ্ধতিতে। এ হিসেবে ৫০০ শিক্ষার্থী এককালীন টাকা দিয়ে আর ৫০০ শিক্ষার্থী মাসিক ভিত্তিতে হলে উঠলে এককালীন ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। এককালীন শিক্ষার্থীপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে ধরা হলে অঙ্কটা দাঁড়ায় ২০,০০০×৫০০ = ১,০০,০০০০০ (এক কোটি টাকা)। মাসিক হিসেবে ভাড়া আদায় করা হলে নেয়া হয় ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার পর্যন্ত। গড়ে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ধরা হলে টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় ২৫০০×৫০০= ১২,৫০,০০০ (সাড়ে বারো লাখ টাকা)।

নয়া শতাব্দীর একসপ্তাহের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে সিট বাণিজ্য, জোর করে প্রোগ্রাম করানো, কথায় কথায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ক্রিকেট স্ট্যাম্প দিয়ে পেটানো, নেত্রীদের ব্যক্তিগত কাজ করানোসহ একাধিক অভিযোগ তুলেছেন হোস্টেলে থাকা সাধারণ ছাত্রীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের এক সহসভাপতি জানান, ইডেন কলেজ প্রশাসন থেকে অনুমোদিত ৬টি হলে ছাত্রলীগের জন্য বরাদ্দ ১০০ রুম। এর ৫০টির নিয়ন্ত্রণে সভাপতি রিভার গ্রুপ বাকি ৫০টির নিয়ন্ত্রণে সাধারণ সম্পাদক রাজিয়ার গ্রুপ। তাদের পছন্দের নেত্রীরা দখল করে রেখেছে এসব রুম। এই নেত্রীর তথ্যমতে— ১০০ রুমের বাইরেও একাধিক রুম একাধিক নেত্রীর নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। প্রত্যেক রুমে ১০ থেকে ১৫ জন করে ছাত্রী থাকে। যাদের রুমের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেত্রী রুমে তুলে থাকেন।

৩ পদ্ধতিতে মেলে সিট: প্রথমত— ছাত্রলীগের পদধারী নেত্রীদের এককালীন টাকা দিয়ে। যা ১৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেয়া হয়। দ্বিতীয়ত— ২ থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে। কেউ কেউ আবার বাৎসরিক চুক্তি করে নেন। আর তৃতীয়ত— লিগ্যাল বা বৈধ পদ্ধতিতে। তবে এ পদ্ধতিতে সিট পাওয়া সহজ নয়। পরে আবার টাকা দিয়ে নেত্রীদের রেফারেন্সে লিগ্যাল হয়ে রুম পরিবর্তন করে নেয়। ইডেন মহিলা কলেজের একাধিক সাধারণ শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।
আরো খবর

ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের একটি সূত্র জানায়, এ বছরের ১৩ মে ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের ৪৮ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। এতে সভাপতির দায়িত্ব পান তামান্না জেসমিন রিভা এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান রাজিয়া সুলতানা। কমিটি ঘোষণার পর পরই রুম দখল নিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠে ছাত্রলীগ। নিজেদের মধ্যে সৃষ্টি হয় অন্তর্কোন্দলের।

নিজেদের মধ্যে এ কোন্দল মেটাতে গত ১৪ জুন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ইডেন কলেজ শাখার নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বসেন। ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের একাধিক নেত্রী নয়া শতাব্দীকে নিশ্চিত করেন, ছাত্রলীগের সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদক অন্তর্কোন্দল দমনে রুম ভাগাভাগি করে দেন। সেখানে জয়-লেখক প্রত্যেক পোস্টেড নেত্রীকে ১টি করে রুম বরাদ্দ দেয়ার নির্দেশ দেন ইডেন কলেজের সভাপতি সম্পাদককে। বাকি রুম সভাপতি এবং সম্পাদকের দখলে থাকবে।

নয়া শতাব্দীর অনুসন্ধানে উঠে আসে ৬/৭ জন নেত্রী বাদে সবাইকেই রুম বুঝিয়ে দিয়েছে রিভা-রাজিয়া। ইডেন কলেজের সবচেয়ে বেশি রুম সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভার দখলে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী জানান, শুধু বঙ্গমাতা হলেই রিভার ১৪টি রুম রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইডেন মহিলা কলেজ শাখা ছাত্রলীগের এক নেত্রী নিশ্চিত করেছেন, কোনো মেয়ে যদি পলিটিক্যাল রুমে থাকে সে যদি আগে টাকা দিয়েও থাকে তবুও নতুন কমিটি গঠন হলে যারা নেতৃত্বে আসে তাদের আবার নতুন করে টাকা দিতে হয়। এই ছাত্রলীগ নেত্রীর তথ্যমতে— নতুন কমিটি ইডেনের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রায় ১ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ১০০ রুম থেকে। ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির এক উপসম্পাদক নয়া শতাব্দীকে বলেন, ‘ইডেনে এটাই হয়। আমি আমার এক পরিচিতকে হলে ওঠাতে সুপারিশ করেছিলাম। ওরা আমার কাছেও টাকা চেয়েছে।’

কলেজ সূত্র জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত ইডেন কলেজে ৩৫ হাজার ছাত্রীর বিপরীতে হাসনা বেগম, খোদেজা খাতুন, আয়শা সিদ্দিকা, জেবুন্নেসা, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (বঙ্গমাতা) ও রাজিয়া হল। এ ছয়টি আবাসিক ছাত্রীনিবাসে আসন আছে ৩ হাজার ৩১০টি। বর্তমানে ছাত্রীনিবাসগুলোতে থাকছেন ৯ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী।

ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের অপর এক সহ সভাপতি নয়া শতাব্দীকে বলেন, ১৪ জুন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের মিটিংয়ে রুম সবার মাঝে সমবণ্টন করার নির্দেশনা দিলেও সেটি মানেনি ইডেন কলেজের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক। তারা তাদের পছন্দের ব্যক্তিদের একাধিক কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছে। যেমন আমি যদি সাধারণ সম্পাদকের কথা বলি তাহলে সবাইকে একটি করে কক্ষ বরাদ্দ দেয়া হলেও তিনি তার অনুসারী সাংগঠনিক সম্পাদক নূরজাহানকে একাধিক কক্ষ বরাদ্দ দিয়েছেন। আবার অনেককে ১টি কক্ষও বরাদ্দ দেয়া হয় নাই। তাহলে এটা তো সমবণ্টন হলো না?

এ নেত্রী অভিযোগ করে বলেন, আমাদের মূল্যায়ন করে না সভাপতি/সম্পাদক। অনেক সময় তারা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আমাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, অপমান করে। তাদের পছন্দ না হলে যাকে তাকে যখন তখন রুম থেকে নামিয়ে দেয়। হলে সভাপতি এবং সম্পাদকই সব— এটা তারা প্রতিটা হলে বলে দিয়েছে। এখানে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য চলে।

আপনি কোনো রুম পেয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নে এ নেত্রী বলেন, হ্যাঁ, আমাকেও ছাত্রলীগ থেকে একটি রুম বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যেখানে আমি আমার অনুসারীদের নিয়ে থাকি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমি নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। আমার পক্ষে বাসা ভাড়া দিয়ে বাইরে থাকা অসম্ভব। প্রথমে ডিপার্টমেন্টে রুমের জন্য দরখাস্ত দেই। সেখানে পাই নাই। পরে এক পলিটিক্যাল আপুর সহায়তায় হলে উঠি। সে সময় সেই নেত্রী আমার কাছ থেকে ১৫ হাজার টাকা নেয়। আর ব্যাংক ড্রাফটে ৭০০০ টাকা দিয়ে আমি লিগ্যাল করে নেই। আমার সঙ্গে আমার এক ফ্রেন্ড ওঠে, ওর কাছে থেকে সেই নেত্রী নেয় ২০ হাজার টাকা। আমার কাছেও ২০ চেয়েছিল, পরে বলে-টলে আমি ১৫ দিয়ে ম্যানেজ করি।’

এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘বর্তমান কমিটির সহ সভাপতি (শিক্ষার্থীর নিরাপত্তার স্বার্থে নেত্রীর নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না) আপুকে আমরা তিন বান্ধবী ১৫ হাজার করে ৪৫ হাজার টাকা দিয়ে হলে উঠি। ওঠার সময় তিনি আমাদের বলেন, আমাদের কোনো প্রোগ্রাম করতে হবে না। কিন্তু হলে ওঠার পরেই আপু আমাদের ওপর মানসিক, শারীরিক টর্চার করতে থাকে। তার ব্যক্তিগত কাজও করায়। একদিন আপুকে বলে ফেলি, আপনার সঙ্গে তো এমন কথা ছিল না। এই কথা বলতেই সে আমাকে ক্রিকেট স্টাম্প নিয়ে পেটাতে আসে। সেসময় আমার বান্ধবীরা আমাকে সেভ করে।’

দ্বিতীয় বর্ষের অপর এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ইডেনে নেত্রীদের এক এক সময় এক এক নিয়ম। এক এক নেত্রীর এক এক নিয়ম। তাদের বাইরে কারো কথা বলার কোনো সুযোগ নেই, তারা যখন খুশি যাকে তাকে হলে ওঠাতে পারে এবং যখন খুশি নামিয়ে দেয়। এখানে তারাই সব।’

নাম না প্রকাশ করার শর্তে ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রলীগের আর এক সহসভাপতি বলেন, ‘আসলে রুম ১০০ নয়, আমাদের (ছাত্রলীগের) তালিকাভুক্ত রুম ৯৮টি। তবে এছাড়াও বিভিন্ন নেত্রীর দখলে একাধিক রুম রয়েছে।’

Print Friendly, PDF & Email

আরও খবর

Sponsered content

Verified by MonsterInsights