অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

দুর্নীতির প্রমাণেও পদ নড়ে না তার

  প্রতিনিধি ৩০ জুলাই ২০২২ , ১:৩৫:৫৯ প্রিন্ট সংস্করণ

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর ও সাইফুল ইসলাম শাকিল, ভাঙ্গা

তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অনেক অভিযোগ। রয়েছে জেলা প্রশাসনের করা আইনানুগ ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ। তবু তিনি বহাল রয়েছেন স্বপদে বছরের পর বছর। তাঁর নাম মুন্সি রুহুল আসলাম। তিনি ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, জেলা প্রশাসক লিখিতভাবে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করলেও ওপরের দিকে ম্যানেজ করে তিনি বহাল তবিয়তে রয়েছেন।

ভাঙ্গা উপজেলার কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সরেজমিন ঘুরে মুন্সি রুহুল আসলামের দুর্নীতি ও অনিয়মের বিষয়ে অনুসন্ধান করে সমকাল। এতে জানা যায়, চলতি বছর এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে স্কুলগুলোতে সরবরাহের জন্য শিক্ষার্থীদের কাব ড্রেস, হলদে পাখির ড্রেস ও অ্যাপ্রোন কেনা বাবদ প্রতি ছয় পিসের মূল্য নিয়েছেন ৪ হাজার ৮০০ টাকা। অথচ এর বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া বায়োমেট্রিক মেশিন ফের চালু করার নামে নিয়েছেন সাড়ে চার হাজার টাকা এবং অগ্নিনির্বাপকের গান পাউডার ক্রয় বাবদ নিয়েছেন ১ হাজার ৫০০ টাকা করে। উপজেলার ১২০টি স্কুলের প্রায় ৫০ হাজার ছাত্রছাত্রীর জন্য জনপ্রতি দুটি মাস্ক ক্রয় বাবদ প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে নিয়েছেন ৬০ টাকা করে মোট ৩০ লাখ টাকা। কিন্তু তাঁর সরবরাহ করা দুটি মাস্কের বাজারমূল্য ছয় টাকা। এতে মোট মূল্য দাঁড়ায় তিন লাখ টাকা।

এর বাইরে মুজিব কর্নারের বই, করোনাসামগ্রী, শিক্ষক আইডি কার্ড, প্রটেকটিভ ডিভাইসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম- যা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির মাধ্যমে কেনার কথা- সেগুলোও রুহুল আসলাম নিজে কিনে সরবরাহ করেন। জানা গেছে, এসব মাল ক্রয়ে বিভিন্ন অনিয়ম ও সরঞ্জাম নিম্নমানের হওয়ায় অনেক প্রধান শিক্ষক নিতে অস্বীকার করেন। যাঁরা নিতে অস্বীকার করেন, রুহুল আসলাম তাঁদের বিভিন্ন অজুহাতে ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ বিভাগীয় মামলা দিয়ে হয়রানি করছেন।

এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে বায়োমেট্রিক মেশিন কেনা বাবদ ২৩ হাজার টাকা, সেটিং করার জন্য দুই হাজার এবং চালু করার জন্য সাড়ে চার হাজার টাকা করে নিয়েছেন প্রধান শিক্ষকদের কাছ থেকে। কিন্তু তিনি যে মেশিনগুলো দিয়েছেন, তার সর্বোচ্চ বাজারমূল্য ৯ হাজার টাকা। স্প্রে মেশিন বাবদ নিয়েছেন দুই হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা। হ্যান্ডওয়াশ বাবদ নিয়েছেন আড়াই হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ৯০০ টাকা। অগ্নিনির্বাপণ সামগ্রী বাবদ নিয়েছেন ছয় হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫০০ টাকা। থার্মাল স্ক্যানার বাবদ নিয়েছেন আড়াই হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা। অক্সিমিটার মেশিন বাবদ নিয়েছেন দুই হাজার টাকা, যার বাজারমূল্য সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ টাকা।

খাতিরের লোককে পদোন্নতি :স্থানীয় খামিনারবাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা মঞ্জু রানী সরকারের অভিযোগ, তাঁর বদলে কনিষ্ঠ একজনকে পদোন্নতি দিয়েছেন রুহুল আসলাম।

মঞ্জু রানী জানান, ভাঙ্গা উপজেলাধীন সুলিনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য হলে বদলি-সংক্রান্ত জ্যেষ্ঠতার নীতিমালায় ওই পদে তাঁর বদলি হওয়ার আবেদনপত্র অগ্রাহ্য করে নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে অন্য এক শিক্ষককে ওই পদে সুপারিশ করেন আসলাম। অথচ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মঞ্জু রানী সরকারকে প্রাথমিক শিক্ষার ঢাকা বিভাগীয় উপপরিচালক বরাবর বদলির জন্য সুপারিশ করেছিলেন।

এ বিষয়ে মঞ্জু রানী সরকার ফরিদপুর-৪-এর সংসদ সদস্য বরাবর ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।

স্থানীয় আতাদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদটি শূন্য হলে ২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে ওই পদে আবেদনের জন্য একটি নোটিশ করা হয়। সেখানে আবেদনের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবুল কালাম মোল্যা, প্রশান্ত মজুমদার ও দিলিপ কুমার আবেদন করেন। এ তিনজনেরই অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে নির্ধারিত সময়ের আবেদনপত্র উপেক্ষা করে ২৭ জানুয়ারি আবেদনকারী সর্বকনিষ্ঠ এক প্রধান শিক্ষকের নাম সুপারিশ করেন রুহুল আসলাম।

প্রতিবাদ করলে মামলা দিয়ে হয়রানি :উপজেলার ভরিলহাট নয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় কুমার দে বলেন, সম্প্রতি তিনি রুহুল আসলামের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেওয়া হয়।

হাজরাকান্দা চরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. নাসিরের ভাষ্য, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা রুহুল আসলামের রোষানলে পড়েনি- এমন শিক্ষক উপজেলায় নেই বললেই চলে। না পারছি সইতে, না পারছি উগরাইতে। আমরা নিরীহ শিক্ষকরা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার রোষানলে পুড়ছি।’

কাজ না করে টাকা উত্তোলন: ভাঙ্গার ১০৪ নম্বর পড়ারন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শান্তিয়া আক্তার ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর রুহুল আসলামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, তিনি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৩ লাখ ৯০ হাজার টাকার কাজের মধ্যে ১ লাখ ১০ হাজার টাকার কাজ করেন। বাকি কাজ না করে সব টাকার চেকে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা তুলে রুহুল আসলাম ও তাঁর সহযোগীদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়ার জন্য তাঁর ওপর চাপ প্রয়োগ করেন। সেই প্রস্তাবে তিনি রাজি না হওয়ায় এবং চেকে সই না করায় রুহুল আসলাম তাঁকে চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেন।

আত্মসাৎ: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি স্কুলের শিক্ষক জানান, স্কুলের সব উন্নয়নমূলক কাজ প্রতি অর্থবছরের ৩০ জুনের মধ্যে সমাপ্ত করার কথা। কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ সমাপ্ত না করে রুহুল আসলাম বাধ্য করেন ওই সব কাজের বিল জুন মাসে উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে দাখিল করার জন্য। সেই বিল পাস করে রুহুল আসলাম তাঁর নিজের পরিচালিত অফিসের হিসাবে জমা করে রেখে দেন। এরপর নানা কৌশলে এসব বিল আত্মসাৎ করেন।

স্থানীয় হাজরাকান্দা চরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ব্যাংক স্টেটমেন্ট থেকে দেখা যায়, ওই বিদ্যালয়ের স্লিপের টাকা ২০২০ সালের ২৯ জুলাই ট্রান্সফার হয়েছে, যা হওয়ার কথা ছিল ৩০ জুনের আগে। বেশিরভাগ বিদ্যালয়ের ব্যাংক স্টেটমেন্টই একই রকম।

মানবিক সাহায্যের টাকাও লোপাট: অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা শিক্ষা অফিস সহায়ক মান্নান মিয়া দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় অভিযুক্ত রুহুল আসলাম উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ের প্রত্যেক শিক্ষকের কাছ থেকে জনপ্রতি ২০০ টাকা করে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং পার্শ্ববর্তী নগরকান্দা উপজেলার এক শিক্ষকের অসুস্থতার কথা বলে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেন।

এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা সমকালকে জানান, রুহুল আসলামের পক্ষ থেকে তাঁরা কোনো আর্থিক সহায়তা পাননি।

ডিসি-ইউএনওর সুপারিশের পরও শাস্তি হয়নি: ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে ভাঙ্গায় কর্মরত রুহুল আসলাম। এর পর থেকে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারী ও জনপ্রতিনিধিদের নানা অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ভাঙ্গা উপজেলা সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা মুকতাদিরুল আহমেদ ২০২০ সালের ১২ ফেরুয়ারি ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বরাবর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করেছিলেন। সেই আলোকে ফরিদপুর জেলা প্রশাসক অভিযুক্ত শিক্ষা কর্মকর্তা আসলামকে অন্যত্র বদলিসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর সুপারিশ করেন। ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর তাঁকে খাগড়াছড়ি জেলার রামগড়ে বদলির আদেশ দেন প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. আবদুল আলীম। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সেই আদেশ বাস্তবায়িত হয়নি।

সংশ্নিষ্টরা যা বলছেন: গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভাঙ্গা উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা রুহুল আসলামের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করেন। তার অনুলিপি বিভিন্ন দপ্তরেও দেওয়া হয়। এ ব্যাপারে ভাঙ্গা উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবদুল কাদের মিয়া বলেন, আমাদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাও এর কপি পেয়েছেন। এরপর অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তাকে আবারও পার্বত্য জেলায় বদলি করা হয়েছিল। কিন্তু এবারও তিনি সেই আদেশ বাতিল করিয়েছেন তদবির করে।

ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকার বলেন, আমরা সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে ওই কর্মকর্তাকে বদলিসহ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এর আগে সুপারিশ করেছি। কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়া-না নেওয়া ওপরের ব্যাপার।

স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মোশায়েদ হোসেন ঢালী সমকালকে বলেন, রুহুল আসলাম ঘুষ-দুর্নীতির ব্যাপারে বেশ বেপরোয়া বলে পরিচিত অনেকের কাছে শুনেছি। সংশ্নিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতনদের উচিত হবে দুর্নীতির এই পাগলা ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরা।

এ প্রসঙ্গে জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এর আগে বেশ কিছু অভিযোগ পেয়েছিলাম। সেই অভিযোগগুলোর নিষ্পত্তি হয়েছে। নতুন করে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার একজন শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, আমাদের কাছে অভিযোগ দিয়ে কোনো ফল না পেয়ে সংশ্নিষ্টরা হতাশ। মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরে অভিযুক্ত ওই কর্মকর্তার নিজস্ব লোক আছে, সেখানে প্রভাব খাটিয়ে তিনি বারবারই বেঁচে যান। এ জন্য তাঁর ব্যাপারে প্রকাশ্যে আর আমরা মুখ খুলতে চাই না।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মুন্সি রুহুল আসলামের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি সব অভিযোগ নাকচ করে দেন। তাঁর দাবি, এগুলোর বেশিরভাগই অনেক পুরোনো। এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

এ ছাড়া কোনো অসুস্থ কর্মচারীর জন্য তিনি কোনো মানবিক সাহায্যের টাকা সংগ্রহ করেননি বলেও দাবি করেন।

Print Friendly, PDF & Email

আরও খবর

Sponsered content

Verified by MonsterInsights