২রা আগস্ট, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ, সোমবার

যে বাঙালি খাবারগুলো রেস্তোরাঁয় পাওয়া যায় না

আপডেট: জুলাই ১৩, ২০২১

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া খ্যাত তারকা কিশোয়ার চৌধুরী প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত রাউন্ডে পান্তা-আলুভর্তা-মাছভাজা পরিবেশন করেছেন। মাস্টারশেফ অস্ট্রেলিয়া নামে রান্নাবিষয়ক জনপ্রিয় টেলিভিশন রিয়েলিটি শোয়ের চূড়ান্ত পর্বে দ্বিতীয় রানার্স-আপ হয়েছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কিশোয়ার চৌধুরী।

প্রতিযোগিতার প্রায় পুরো মৌসুম জুড়ে বাংলাদেশী বিভিন্ন ঘরোয়া রান্না উপস্থাপন করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন তিনি।

গ্র্যান্ড ফিনালেতে পান্তা-আলুভর্তা-মাছভাজা পরিবেশন করে কিশোয়ার বলেছেন, এটি এমন এক ডিশ যা বাংলাদেশে খুব জনপ্রিয় ও প্রচলিত, কিন্তু রেস্তোরাঁতে পাওয়া যায় না এই খাবার।

বাংলাদেশে এমন অনেক খাবার আছে যা কেবল কোনো একটি বা একাধিক অঞ্চলে নয়, দেশজুড়েই পরিচিত এবং জনপ্রিয়, কিন্তু সচরাচর রেস্তোরাঁতে পাওয়া যায় না সেসব খাবার। যেমন এর মধ্যে সহজেই বলা যায় পান্তা-ভর্তা, খুদের ভাত, কুমড়া ফুলের বড়া, মাছের পাতুরি কিংবা কাঁচা কাঁঠাল বা এঁচোড়ের নানা পদসহ অনেক খাবারের নাম।

রেস্তোরাঁতে কেন পাওয়া যায় না সে সব খাবার?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শারমিন রুমী আলীম বলছেন, এ অঞ্চলের মানুষ সাধারণত বাড়িতে খাওয়া হয় যেসব পদ, সেগুলো আনুষ্ঠানিক আয়োজনে পরিবেশন করে না, এটা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক চর্চার অংশ।

তিনি বলেন, এখানে উৎসব বা আনুষ্ঠানিকতা মানেই রিচ ফুড, মানে অতিরিক্ত তেল-মসলা দিয়ে রান্না খাবার দেয়া হবে অতিথির পাতে, বহুকাল ধরে সেটাই চর্চা। আর এ কারণেরই রেস্তোরাঁতেও আনুষ্ঠানিক খাবারই পরিবেশন করা হয়। তবে এর একটা আর্থ-সামাজিক দিকও রয়েছে। পকেটের পয়সা খরচ করে দোকানে গিয়ে লোকে ঘরের আটপৌরে খাবার খেতে চায় না।

ফুড ব্লগার সোনম সাহা বলছেন, ‘ঘরোয়া জনপ্রিয় রান্নাগুলোর উৎপত্তি হয়েছে সময় ও অর্থের সাশ্রয় এবং খাদ্য উপাদানের সহজলভ্যতা থেকে। আর রেস্টুরেন্ট কনসেপ্টটা বাঙালির কাছে মূলত ঘরে যা সচরাচর রান্না হয়না সেই সব খাবারের জায়গা। ফলে স্বাভাবিক ধারণা হচ্ছে, ঘরোয়া খাবার রেস্তোরাঁয় রান্না হবে না। তবে এই সময়টাও পাল্টে যাচ্ছে বলে মনে করেন মিজ সাহা।

এখন পরিবারের নারী সদস্যেরা কেবলই গৃহিনী হন না, বাইরে কাজ করেন।

আর নারী-পুরুষ দু’জনই যখন বাইরে কাজ করেন, ঘরের খাবারের স্বাদ তারা খুঁজবেনই-আর সেখান থেকেই ঘরোয়া রান্নার, দেশি এবং আঞ্চলিক খাবারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে বলে মনে করেন ফুড ব্লগার সোনম সাহা, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষকতাও করেন।
তবে জনপ্রিয়তা বাড়ার পরেও সচরাচর রেস্তোরাঁতে দেখা যায় না, তেমন কয়েকটি খুব পরিচিত ও জনপ্রিয় ঘরোয়া খাবার সম্পর্কে চলুন আরেকটু জেনে নিই।

পান্তাভাত-ভর্তা-মাছ ভাজা
বাংলা নববর্ষ পালনের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে পান্তা আর ইলিশ ভাজা। তুমুল জনপ্রিয় এই খাবার রেস্তোরাঁয় পাওয়া সচরাচর দেখা যাবে না। তবে বিশেষ দিনে মানে পয়লা বৈশাখের দিনে পাঁচতারা হোটেল কিংবা ফুটপাতের ফুডকোর্ট-সবখানেই পান্তা-ইলিশ পাওয়া যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রামীণ বাংলার প্রতীকে পরিণত হওয়া এই পান্তা আর ইলিশ কিন্তু সাধারণ বাঙালি কমই খান।

দেশের সবখানে দৈনন্দিন লোকে যে পান্তাভাত খায়, তার সাথে একটু ভর্তা আর ছোট কোনো মাছের ভাজাই সবচেয়ে প্রচলিত।

অধ্যাপক শারমিন রুমী আলীম বলছেন, পান্তা শরীরে শক্তি দেয়, অনেকক্ষণ পেটে থাকে। এটি হজমের জন্য ভালো, পেটের গ্যাস দূর করে।

খুদের ভাত
চালের ভাঙ্গা অংশকে অর্থাৎ ভাঙ্গা চালকে খুদের চাল বলে। বাংলাদেশের প্রায় সব অঞ্চলেই খুদের চাল বা ভাঙ্গা চাল ভাত দিয়ে রান্না করা হয়। একে বউয়া ভাতও বলে অনেক জায়গায়। খুদের চাল সেদ্ধ করে পেয়াজ-মরিচ দিয়ে ভেজে বানানো হয় খুদের ভাত। সাথে নানা রকম ভর্তা পরিবেশন করা হয়।

সাধারণত এটি রান্না করা হয় যখন বাড়িতে চাল কম থাকে, তেমন একটি সময়ে। তবে যেমন এর স্বাদ তেমনি এর পুষ্টিও ব্যাপক।

ভিটামিন বি-টু অনেক বেশি পরিমাণে থাকে। সাথে সবজি ও মাছের ভর্তার পুষ্টিও যোগ হয়। পরিচিত এই খাবারটিও রেস্তোরাঁয় দেখা যায় না।

মাছের পাতুরি
ঢাকাসহ বিভিন্ন শহুরে এলাকায় এখন পাতুরি নামে রেস্তোরাঁ দেখা যায়, কখনো রেস্তোরাঁর মেনুকার্ডেও পাতুরি লেখা খাবারের পদ থাকে। কিন্তু খাবার নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন এমন মানুষেরা বলছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিশেষ করে নদী প্রধান এলাকাগুলোতে যেভাবে মাছের পাতুরি করা হয়, নাগরিক পাতুরির সাথে তার বিরাট ফারাক।

সাধারণত মসলা মাখিয়ে নানা আকারের মাছ কলাপাতায় মুড়ে চুলার আগুনে দিয়ে রাখতে হয়, কিছুক্ষণ পর মসলা মাছে ঢুকে ভাপে সেদ্ধ হয়ে যায়। পরে ভাতের সাথে পরিবেশন করা হয় সেটি। কিন্তু নাগরিক পাতুরি লাউ শাক বা অন্য বড় পাতাওয়ালা শাক মুড়েও সেদ্ধ করা হয়।

ফুড ব্লগার সোনম সাহা বলছেন, মাছের পাতুরির ধারণা এসেছে মূলত সাশ্রয়ের ধারণা থেকে, মানে তেল কম, আগুনের জন্য লাকড়ি খরচ নাই বলতে গেলে। এসব মিলিয়ে এটি নদী-প্রধান এলাকাগুলোতে খুবই জনপ্রিয় মাছের পদ। কিন্তু সৌখিন পদ নয়, যে কারণে অনুষ্ঠান বা পার্বণে পরিবেশন হয় না এটি।

কুমড়া ফুলের বড়া
কুমড়ো ফুল চালের গুঁড়া আর ডিম, একটু মসলা গুড়া দিয়ে মেখে কিছুক্ষণ রেখে গরম তেলে ভেজে তোলা এই খাবার ভাত এবং খিচুড়ি দুয়ের সাথেই ব্যাপক জনপ্রিয়।

বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকাতেই এই খাবারটি খাওয়া হয়, কিন্তু প্রচলিত রেস্তোরাঁতে পাওয়া যাবে না এই খাবার। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ঘরোয়া রান্নার কিছু পেইজে অর্ডার করা যাচ্ছে এ খাবার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক শারমিন রুমী আলীম বলছেন, কুমড়া ফুল খুবই পুষ্টিকর। এটি বিটা ক্যারোটিন এবং ফাইবার বা আঁশ সমৃদ্ধ খাবার।

এঁচোড় বা কাঁচা কাঁঠাল রান্না
এচোঁড় বা কাঁচা কাঁঠালের রান্না বেশ পরিচিত খাবার। কাঁঠাল আমাদের জাতীয় ফল এ জন্যই কারণ এটা ছিলো সুলভ আর সস্তা। কাঁচা কাঁঠালের নানান পদ এর আবির্ভাব সেভাবেই৷

ফুড ব্লগার মিজ সাহা বলছেন, গরীব মানুষের কাছে এটি মাংসের স্বাদের বিকল্পও বলা যায়। পথের পাঁচালিতে দেখবেন কাঁচা কাঁঠাল সর্বজয়া মাংসের মতো করে রান্না করে,অপু আর দূর্গা মাংসের মতো হয়েছে বলে স্বান্তনা পায়।

তিনি বলছেন, আজকাল অনেকে মাংসা বা চিংড়ি মাছ দিয়ে কাঁচা কাঁঠাল রান্না করছেন, কিন্তু আসল এচোঁড় খালি-ই রান্না করা হয়। এটিও দেশব্যাপী পরিচিত কিন্তু রেস্তোরাঁতে এখনো দেখা যায় না। এই খাবার।

সূত্র : বিবিসি

Print Friendly, PDF & Email
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

বরিশাল খবর ২৪.কমে প্রকাশিত-প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।