৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং, শুক্রবার

বাংলা থেকে বিলীনের পথে মৌমাছি

আপডেট: জুলাই ১৫, ২০২০

  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

সাব্বির আলম বাবুঃ
“মৌমাছি মৌমাছি
কোথা যাও নাচি নাচি, দাড়াওনা একবার ভাই। ঐ ফুল ফোঁটে বনে,
যাই মধু আহরনে
দারাবার সময় তো নাই।”
কবি নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের বিখ্যাত সেই কবিতায় মৌমাছিদের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আজ গ্রাম বাংলায় তেমন একটা চোখে পড়ে না। তাই মৌমাছি এখন কেবল গবেষণার বিষয়বস্তু হিসাবেই থেকে যাচ্ছে। অথচ এক সময় বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সহ প্রায় সর্বত্র এমনকি যেকোন বাড়ীর আঙ্গিনায় বা বাগানে বাসা বেঁধে মৌচাক তৈরী করতো মৌমাছিরা। কিন্তু কালের বিবর্তনে এরা হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বাসোপযোগী পরিবেশের অভাব, খাদ্যাভাব, ফসল ও ফুলে অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ , অদক্ষ মধু সংগ্রহকারীদের দ্বারা মৌমাছি নিধন, বনজঙ্গল কেটে উজার করে যত্রতত্র মানুষের আবাসস্থল তৈরী করা ইত্যাদি। এর ফলে মৌমাছির সংখ্যা কমে যাওয়ার পাশাপাশি মধু না পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন ফুলের পরাগায়ন না হওয়ায় ফল ও ফুলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। তবে অতীতে শহরে বা গ্রামের ঘরের কোনেও মৌমাছির তৈরি মৌচাক দেখা যেত সহজেই। গ্রামে প্রবাদ আছে যে, ভালো-মন্দ বুঝে মৌমাছিরা ঐ এলাকার বা বাড়ীতে বাসা বাধতো। আবার মৌমাছির ঝাঁক দেখে ও তাদের গুন গুন গুঞ্জন শুনে অনেকেই তাদের বাড়ীর বাড়ীর ঢেঁকিতে ধান ভানতেন। তাদের ধারনা ছিল এতে নাকি মৌমাছিরা ঢেঁকির শব্দ শুনে সেই বাড়ীতে বাসা বানাতো। সেই সব অহরহ বিচরন করা মৌমাছি ও মৌচাক বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে কবির কবিতার মতোই বইয়ের পাতায় এখন সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রজন্ম এখন কালভদ্রে দেখবে সীমিত আকারে গবেষণালব্ধ চাষের মৌমাছি, প্রকৃতির স্বাধীন মৌমাছি নয়। কখনো কখনো হয়তো রবি শস্য, মৌসুমি ফুল, ফল ও বীজ চাষের ক্ষেতের পাশে কিছু সংখ্যক মৌমাছির দেখা মেলে। মৌচাষী মোর্শেদ জানান, আগে মৌচাক থেকে মাসে দুইবার মধু সংগ্রহ করা যেতো। এক একটি মৌচাক থেকে প্রতিবারে ৫/৬ কেজি মধু সংগ্রহ করা যেতো। স্বাস্থ্য ও পুস্টিবীদদের মতে, মধুর রয়েছে ব্যাপক ঔষধি ও পুস্টিগুন। শিশু থেকে বয়ষ্ক সবাই মধুর স্বাদে আসক্ত। কারন প্রতিদিন সকালে দুই চামচ মধু গরম দুধের সাথে মিশিয়ে খেলে ঠান্ডা জনিত কোন রোগ আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। এছাড়াও ভেষজ হিসাবে মধুর ঔষধি ব্যবহার হয়ে আসছে প্রাচীনকাল থেকেই। এজন্য আগে গ্রামে মাটির কলস ভর্তি করে মধু সংরক্ষন করা হতো। বিভিন্ন রোগের প্রতিরোধে মহৌষধ হিসাবে মধুকে বিবেচনা করা হয়। মহিলাদের ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি, কোমলতা বাড়ানো জন্য এটি ব্যবহৃত হয়। মৌমাছির জীবনচক্র নিয়ে পরিবেশবিদদের মতে, পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার আদর্শ ও অনুকরনীয় প্রানী হচ্ছে মৌমাছি। এরা নিজেদের মধ্যে নির্দিষ্ট বিধিবিধান ও সুশৃঙ্খলতা মেনে চলে। বিভিন্ন মৌমাছির প্রত্যেক দলে রাজা, কারিগর, কর্মী ও কেবল একজন করে রানী মৌমাছি থাকে। কর্মী মৌমাছিরা সারাদিন বিভিন্ন জায়গা ঘুরে নানা জাতের ফুল থেকে রানীর জন্য মধু সংগ্রহ করে। এই দলে সবাই নিজ নিজ দ্বায়িত্ব নিয়ম মতো করলেও ডিম পাড়া ছাড়া রানীর কোন কাজ থাকে না। কারিগর মৌমাছিরা নিজের গায়ের নিঃসৃত মোম দিয়ে চমৎকার করে কারুকার্যময় খোপ খোপ করে বাসা তৈরী করে। শান্তিপ্রিয় এই প্রানীকে কেউ বিরক্ত করলে সে হুল ফোটায়। মৌমাছির হুল খুবই বিষাক্ত। তাছাড়া মৌমাছির মোম উৎকৃষ্ট বাতি হিসাবে ব্যবহার করা হয়। পৃথিবীতে বিভিন্ন প্রকার মৌমাছি থাকলেও এপিস সেরানা জাতের মৌমাছি বাংলাদেশে বেশী দেখা যায়। কিছু অসচেতন ও অপরিনাম স্বার্থান্বেষী মানুষের কারনে আজ পরিশ্রম আর শৃঙ্খলার প্রতীক মৌমাছি বিলীন পরিবেশ ধ্বংসের পথে।

Print Friendly, PDF & Email
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন

বরিশাল খবর ২৪ প্রকাশিত-প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।